টিপস

বিভিন্ন উদ্ভিদের ভেষজ গুনাগুন

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এগিয়েছে অনেক৷ তবুও বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষ রোগ সারাতে এখনো ভরসা রাখেন ভেষজ চিকিৎসায়৷ ক্যানসার থেকে শুরু করে সব ধরনের রোগেরই চিকিৎসা আছে প্রাচীনতম এই পদ্ধতিতে৷ এমনকি বিশ্বের ৭০ শতাংশ ঔষধও তৈরি হয় ভেষজ পদার্থ থেকেই৷

অর্জুন

ভেষজশাস্ত্রে ওষধি গাছ হিসাবে অর্জুনের ব্যবহার বলা হয়েছে। এই উদ্ভিদ কমব্রিটেসি গোত্রের অন্তর্ভুক্ত। এর বৈজ্ঞানিক নাম ‘টারমিনালিয়া অরজুনা’, সংস্কৃত নাম ককুভ। বৃহদাকৃতির বহুবর্ষজীবী এই উদ্ভিদটি প্রায় ১৮-২৫ মিটার উচ্চতা বিশিষ্ট হয়ে থাকে। গাছটির মাথা ছড়ানো ডালগুলো নীচের দিকে ঝুলোনো থাকে। পাতা দেখতে অনেকটা মানুষের জিহ্বাকৃতির। ছাল খুব মোটা এবং ধূসর বর্ণের। গাছ থেকে সহজেই ছাল ওঠানো যায়। ফল দেখতে কামরাঙার মতো, পাঁচ খাঁজ বিশিষ্ট কিন্তু আকৃতিতে অনেক ছোট।

ভেষজ গুণ

  • বুক ধড়ফড় করলে অর্জুন ছাল কাঁচা হলে ১০-১২ গ্রাম, শুকনো হলে ৫-৬ গ্রাম একটু ছেঁচে ২৫০ মিলি দুধ ও ৫০০ মিলি জলের সাথে মিশিয়ে জাল দিয়ে আনুমানিক ১২৫ মিলি থাকতে ছেঁকে খেলে বুক ধড়ফড়ানি কমে যায়। তবে পেটে যাতে বায়ু না থাকে সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে।
  • অর্জুন ছাল বেটে খেলে হৃৎপিন্ডের পেশি শক্তিশালী হয় কার্যক্ষমতা বাড়ে। এটি রক্তের কোলেস্টরল কমায় এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে।
  • বিচুর্ণ ফল মূত্রবর্ধক হিসেবে কাজ করে এবং লিভারসিরোসিসের টনিক হিসাবে ব্যবহৃত হয়।
  • অর্জুনের ছালে ট্যানিন রয়েছে, এ টানিন মুখ, জিহ্বা ও মাড়ির প্রদাহের চিকিৎসায় ব্যাবহার হয়। এটি মাড়ির রক্তপাত বন্ধ করে এবং শরীরে ক্ষত, খোস পাঁচড়া দেখা দিলে অর্জুনের ছাল বেঁটে লাগালে সেরে যায়।
  • অর্জুনের ছাল হাঁপানি, আমাশয়, ঋতুস্রাবজনিত সমস্যা, ব্যথা, প্রদর ইত্যাদি চিকিৎসায়ও উপকারী।
  • এ ছাড়া অর্জুনে স্যাপোনিন রয়েছে, এটি যৌন উদ্দীপনা বাড়ায়। অর্জুনের ছালের রস যৌন উদ্দীপনা বাড়াতেও ব্যবহার হয়।
  • অর্জুন গাছের তেল খাদ্য হজম ক্ষমতা বাড়ায়। খাদ্যতন্ত্রের ক্রিয়া স্বভাবিক রাখতে সাহায্য করে।
  • ক্যানসার কোষের বর্ধন রোধকারী গ্যালিক অ্যাসিড, ইথিগ্যালি, লিউটেনোলিন রয়েছে অর্জুন ছালে। এ কারণে এটি ক্যানসার চিকিৎসায় ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।

অশ্বগন্ধা

অশ্বগন্ধা একটি ভেষজ উদ্ভিদ। এই গাছের পাতা সেদ্ধ করলে ঘোড়ার মূত্রের মতো গন্ধ বেরোয় বলে একে অশ্বগন্ধা বলে হয়।এই পাতার বৈজ্ঞানিক নাম ‘উইথানিয়া সোমনিফেরা (এল) ডুনাল’। আয়ুর্বেদে একে বলা হয় বলদা ও বাজিকরি।

অশ্বগন্ধা গাছের মূল এবং পাতা স্নায়ুর বিভিন্ন রোগে ব্যবহৃত হয়। এই গাছ বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকায় পাওয়া যায়। ঘুম আনার ওষুধ হিসাবে প্রাচীন মেসোপটেমিয়া এবং মিশরে এর ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়।

অশ্বগন্ধার মূল, পাতা, ফুল, ফল, ছাল, ডাল সবই ওষুধ হিসাবে ব্যবহার করা হয়। গাছটি সাধারণত দুই-আড়াই হাত উঁচু হয় এবং শাখাবহুল। এতে ছোট ছোট মটরের মতো ফল হয়।

ভেষজ গুণ

  • শক্তিবর্ধক: এ গাছের রস শক্তিবর্ধক। শুক্রাণু বাড়াতে অশ্বগন্ধার নাম সুবিদিত।
  • অশ্বগন্ধার এর মূল ও পাতা স্নায়ুবিক বিভিন্ন রোগে উপশম আনে। দুধ ও ঘিয়ের সঙ্গে পাতা ফুটিয়ে খেলে শরীরে বল পাওয়া যায়। ইনসমনিয়ায় বা অনিদ্রায় ভুগলে অশ্বগন্ধা উত্তম ওষুধ হিসাবে কার্যকর হতে পারে।
  • ভালো ঘুমের জন্য অশ্বগন্ধা গুঁড়ো চিনিসহ ঘুমানোর আগে খেতে পারেন।
  • সর্দি-কাশি থেকে মুক্তি পেতে অশ্বগন্ধার মূল গুঁড়ো করে খাওয়া যেতে পারে।
  • চোখের ব্যথা দূর করতে অশ্বগন্ধা বিশেষ উপকারী।
  • ক্রনিক ব্রংকাইটিসের ক্ষেত্রেও অশ্বগন্ধা একটি কার্যকর ওষধু। অশ্বগন্ধার মূল অন্তর্ধুমে পুড়িয়ে (ছোট মাটির হাঁড়িতে মূলগুলো ভরে সরা দিয়ে ঢেকে পুনঃমাটি লেপে শুকিয়ে ঘুটের আগুনে পুড়ে নিতে হয়। আগুন নিভে গেলে হাঁড়ি থেকে মূলগুলো বের করে গুঁড়ো করে নিতে হয়) ভালো করে গুঁড়িয়ে নিয়ে আধা গ্রাম মাত্রায় একটু মধুসহ চেটে খেলে ক্রনিক ব্রংকাইটিসে উপকার হয়।
  • মানসিক ও শারীরিক দুর্বলতা, যেমন মাথা ঝিমঝিম করে ওঠা, সংজ্ঞাহীনতা, অবসাদ প্রভৃতি দূর করে অশ্বগন্ধা। মনোযোগ বাড়ায়। ক্লান্তি দূর করে সঞ্জীবনী শক্তি পুনরুদ্ধার করে।
  • অম্বল-অজীর্ন, পেট ফাঁপা এবং পেটের ব্যথা নিরাময় সহ যকৃতের জন্য ভীষণ উপকারী অশ্বগন্ধার ফল। হজমের সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। তবে অশোধিত অশ্বগন্ধা গুঁড়ো বা পাউডার হজমে গোলমাল সৃষ্টি করে। এর ফলে তলপেটে ব্যথা উঠতে পারে। সুতরাং যাদের হজমশক্তি দুর্বল, তাদের অবশ্যই ভালো মানের অশ্বগন্ধা সেবন করতে হবে।

আদা

আদা মূলত গাছের শিকড়। মসলা হিসেবে আদার ব্যবহার সব খাবারকেই সুস্বাদু করে, একেবারে জিভে জল এনে দেয়। আদায় রয়েছে কিছু রোগের অসাধারণ নিরাময় ক্ষমতা।

আদার কয়েকটি উপকারিতা

  • ১। মাথা ব্যথা ও উচ্চ রক্তচাপ থাকলে খেটে পারেন আদার চা। রক্তচাপ স্বাভাবিক হয়ে আসবে, মাথাব্যথারও উপশম হবে।
  • ২। মাতৃত্বকালীন বমি বমি ভাব কিছুটা হলেও কমায় আদা।
  • ৩। শরীরের জয়েন্টে ব্যথা হলে আদা কুচি কুচি করে খেলে আরাম পাওয়া যায়।
  • ৪। শ্বেতী রোগ ? আদা বেঁটে দিনে তিন থেকে চার বার লাগান। চার থেকে বারো সপ্তাহ নিয়মিত ব্যবহারে উপকার পাবেন।
  • ৫। নিয়মিত আদা খেলে অফুরান প্রাণশক্তি পাওয়া যায়। কমে যায় রোগব্যাধি।
  • ৬। খাবার হজম হচ্ছে না ? পেটে গুড় গুড়, আদাজল খেয়ে নিন। আরাম পাবেন।
  • ৭। অপারেশনের পর কাঁচা আদা খান, দ্রুত সেরে উঠবেন।
  • ৮। সর্দি লাগলে আদা কুচি করে রুমালে নিয়ে নাকে ঝাঁজ নিন। বন্ধ নাক খুলে যাবে।
  • ৯। ভ্রমণের সময় বমি ভাব এলে যদি মুখে এক টুকরো আদা দেন দেখবেন বমি ভাব উধাও।
  • ১০। হজমে গোলযোগ হলে আদা কিংবা আদা চা খেতে পারেন। দ্রুত সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারবেন।
  • ১১। শীতকালে অনেকেরই শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। এই শ্বাসকষ্টের বিরুদ্ধে লড়াই করার অসাধারণ এক ক্ষমতা আছে আদায়। এ ছাড়া বুকে কফ জমে কিংবা ঠান্ডা লেগে যাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা দেখা দেয়, তাদের জন্য প্রাকৃতিক ওষুধ হলো আদা।
  • ১২। এতে থাকা ভিটামিন, মিনারেল ও অ্যামাইনো অ্যাসিড শরীরে রক্ত চলাচল বাড়ায় এবং হৃৎপিণ্ডকে কর্মক্ষম রাখে। এটি ধমনি থেকে অতিরিক্ত চর্বি সরিয়ে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকিও কমিয়ে দিতে পারে।
  • ১৩। রক্ত সঞ্চালনের গতিকে স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। এ ছাড়া রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতাকেও বাড়িয়ে দিতে পারে এই মসলা। এর উপাদানগুলো পেশির কর্মদক্ষতাÿবাড়ায়। আবার ব্যথা প্রশমনেও কার্যকর।
  • ১৪। অনেক কারণে আমরা মানসিক চাপ ও অস্থিরতায় ভুগে থাকি। এক গবেষণায় দেখা গেছে, আদায় থাকা কিছু উপাদান মানসিক চাপ দূর করতে সাহায্য করে।
  • ১৫। মাসিকের সময় অনেকেরই তল পেট ব্যথা ও শারীরিক অস্বস্তি দেখা দিতে পারে, এ ধরনের সমস্যা এড়াতেও আদা খেয়ে দেখতে পারেন।

আমলকী

আমলকী হল আমাদের দেহের জন্য সব চাইতে উপকারী ভেষজের মধ্যে একটি। এটি আপনি প্রতি দিনই খেতে পারেন এবং এর কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। বরং আছে দারুণ সব উপকার। প্রতি দিন একটি করে আমলকী খেতে পারেন। কিংবা আমলকীর আচার। খেতে পারেন আমলকীর মোরব্বা কিংবা আমলকীর পাউডার ব্যবহার করতে পারেন রান্নায়। এই সামান্য আমলকী আপনার দেহেকে সুস্থ সবল রাখতে সাহ্যায্য করবে।

প্রতিদিন একটি আমলকী খাওয়ার ২০টি উপকারিতা হল :

  • ১) আমলকী চুলের টনিক হিসেবে কাজ করে এবং চুলের পরিচর্যার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এটি কেবল চুলের গোড়া মজবুত করে তা নয়, এটি চুলের বৃদ্ধিতেও সাহায্য করে।
  • ২) এটি চুলের খুসকির সমস্যা দূর করে ও পাকা চুল প্রতিরোধ করে।
  • ৩) আমলকীর রস কোষ্ঠকাঠিন্য ও পাইলসের সমস্যা দূর করতে পারে। এ ছাড়াও এটি পেটের গোলযোগ ও বদহজম রুখতে সাহায্য করে।
  • ৪) এক গ্লাস দুধ বা জলের সঙ্গে আমলকী গুঁড়ো ও সামান্য চিনি মিশিয়ে দিনে দু’বার খেতে পারেন। এটি অ্যাসিডিটির সমস্যা কম রাখতে সাহায্য করবে।
  • ৫) আধা চূর্ণ শুষ্ক ফল এক গ্লাস জলে ভিজিয়ে খেলে হজম সমস্যা কেটে যাবে। খাবারের সঙ্গে আমলকীর আচার হজমে সাহায্য করে।
  • ৬) প্রতি দিন সকালে আমলকীর রসের সঙ্গে মধু মিশে খাওয়া যেতে পারে। এতে ত্বকের কালো দাগ দূর হবে ও ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়বে।
  • ৭) আমলকীর রস দৃষ্টিশক্তি বাড়াতে সাহায্য করে। এ ছাড়াও চোখের বিভিন্ন সমস্যা যেমন চোখের প্রদাহ, চোখ চুলকানি বা জল পড়ার সমস্যা থেকে রেহাই দেয়।
  • ৮) আমলকী চোখ ভাল রাখার জন্য উপকারী। এতে রয়েছে ফাইটো-কেমিক্যাল যা চোখের সঙ্গে জড়িত ডিজেনারেশন প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে।
  • ৯) এ ছাড়াও প্রতি দিন আমলকীর রস খেলে নিঃশ্বাসের দুর্গন্ধ দূর হয় এবং দাঁত শক্ত থাকে।
  • ১০) আমলকীর টক ও তেঁতো মুখে রুচি ও স্বাদ বাড়ায়। রুচি বৃদ্ধি ও খিদে বাড়ানোর জন্য আমলকী গুঁড়োর সঙ্গে সামান্য মধু ও মাখন মিশিয়ে খাওয়ার আগে খেতে পারেন।
  • ১১) রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং মানসিক চাপ কমায়।
  • ১২) কফ, বমি, অনিদ্রা, ব্যথা-বেদনায় আমলকী অনেক উপকারী।
  • ১৩) ব্রঙ্কাইটিস ও অ্যাজমার জন্য আমলকীর জুস উপকারী।
  • ১৪) শরীর ঠাণ্ডা রাখে, শরীরের কার্যক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে, পেশি মজবুত করে।
  • ১৫) এটি হৃদযন্ত্র, ফুসফুসকে শক্তিশালী করে ও মস্তিষ্কের শক্তিবর্ধন করে। আমলকীর আচার বা মোরব্বা মস্তিষ্ক ও হৃদযন্ত্রের দুর্বলতা দূর করে।
  • ১৬) শরীরের অপ্রয়োজনীয় ফ্যাট ঝরাতে সাহায্য করে।
  • ১৭) লোহিত রক্তকণিকার সংখ্যা বাড়িয়ে তুলে দাঁত ও নখ ভাল রাখে।
  • ১৮) এর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান বুড়িয়ে যাওয়া ও সেল ডিজেনারেশন প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে।
  • ১৯) সর্দি-কাশি, পেটের পীড়া ও রক্তশূন্যতা দূরীকরণে বেশ ভাল কাজ করে।
  • ২০) ব্লাড সুগার লেভেল নিয়ন্ত্রণে রেখে ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। কোলেস্টেরল লেভেলেও কম রাখতে যথেষ্ট সাহায্য করে।

কামরাঙা

কামরাঙা একটি চিরসবুজ ছোট মাঝারি আকৃতির গাছের টকমিষ্টি ফল। বৈজ্ঞানিক নাম অ্যাভারোয়া ক্যারামবোলা ইংরেজি নাম চাইনিজ গুসবেরি, ক্যারামবোলা। ফল কাঁচা অবস্থায় সবুজ এবং পাকলে হলুদ। কামরাঙা টক স্বাদযুক্ত বা টকমিষ্টি হতে পারে। কোনও কোনও গাছে একাধিক বার বা সারা বছরই ফল পাওয়া যায়। এটি ভিটামিন এ ও সি-এর ভালো উৎস। সেপ্টেম্বর থেকে জানুয়ারিতে ফল পাওয়া যায়।

উপকারিতা

কামরাঙার ঔষধিগুণও বিস্ময়কর। সুস্বাস্থ্যের জন্য খাদ্য তালিকায় কামরাঙা রাখতে পারেন প্রতি দিন।

অন্ত্রের ক্যানসার প্রতিরোধ করে

কামরাঙা রুচি ও হজমশক্তি বাড়ায়। পেটের ব্যথায় কামরাঙা খুব উপকারী। কামরাঙায় আছে অ্যালজিক অ্যাসিড। এটি অন্ত্রের ক্যানসার প্রতিরোধ করে।

রক্ত পরিষ্কারক

কামরাঙা রক্ত পরিশোধন করে। কামরাঙ্গার পাতা ও কচি, ফলে আছে ট্যানিন, যা রক্ত জমাট বাঁধতে সাহায্য করে।

সর্দিকাশিতে উপকারী

কামরাঙা পুড়িয়ে ভর্তা করে খেলে ঠান্ডাজনিত সমস্যা থেকে মুক্তি মেলে। দীর্ঘদিনের জমাট সর্দি বের করে দিয়ে কাশি উপশম করে। শুকনো কামরাঙা জ্বরের জন্য খুব উপকারী।

কৃমিনাশক

কামরাঙা পাতা ও ডগার গুঁড়ো খেলে জলবসন্ত ও বক্রকৃমি নিরাময় হয়। কৃমির সমস্যা সমাধানে কামরাঙা ফলও উপকারী। কামরাঙ্গার রসের সাথে নিমপাতা মিশিয়ে খেলে কৃমি দূর হয়।

অর্শ রোগে উপকারী

২ গ্রাম পরিমাণ শুকনো কামরাঙ্গার গুঁড়ো জলের সঙ্গে রোজ এক বার করে খেলে অর্শ রোগে উপকার পাওয়া যায়। আর বাতের ব্যথায়ও কামরাঙা বেশ উপকারী।

 

কালমেঘ

কালমেঘ আমাদের দেশে একটি বহুল প্রচলিত ভেষজ উদ্ভিদ। এই গাছের গড় উচ্চতা ১ মিটার। এই গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদের ১ সেমি লম্বা ফুলের রং গোলাপী। দেড় থেকে দু সেমি লম্বা ফল অনেকটা ধানের মতো দেখতে। অকেনথেসি বর্গের অন্তর্ভুক্ত এই গাছটির বৈজ্ঞানিক নাম অ্যান্ড্রোগ্রাফিস পানিকুলাটা। ভারতের পূর্বাঞ্চল, হিমাচল প্রদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গে জন্মে থাকে। আর্দ্র ও অন্ধকারময় স্থানে এই উদ্ভিদের ভালো বৃদ্ধি হয়। তবে অল্প আলোকে বেশি চাষ হয়। সাধারণ ভাবে বিনা যত্নেই এই গাছ বেড়ে ওঠে। শিকড় ছাড়া কালমেঘ গাছের সব অংশই ওষুধের কাজে লাগে। কালমেঘের স্বাদ অত্যন্ত তেতো। জ্বর, কৃমি, আমাশয়, সাধারণ শারীরিক দুর্বলতা এবং বায়ু আধিক্যে কালমেঘ অত্যন্ত উপকারী।

তরিতরকারি হিসাবে কালমেঘ পাতা খাওয়া না হলেও ওষুধ হিসাবে এর বহুল ব্যবহার রয়েছে।শিশুদের যকৃৎ রোগে এবং হজমের সমস্যায় কালমেঘ ফলপ্রদ। কালমেঘের পাতা থেকে তৈরি আলুই পশ্চিমবঙ্গের ঘরোয়া ওষুধ যা পেটের অসুখে শিশুদের দেওয়া হয়।বড়দেরও পেটের বিভিন্ন রোগের ক্ষেত্রে কালমেঘ পাতা বেশ উপকারি। টাইফয়েড রোগে এবং জীবাণুরোধে কালমেঘ কার্যকর।

ভেষজ গুণ

  • কালমেঘ গাছের পাতার রস জ্বর, কৃমি, অজীর্ণ, লিভার প্রভৃতি রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়।
  • কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা থাকলে পাতার রস মধুর সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়ানো হয়।
  • এ গাছের রস রক্ত পরিষ্কারক, পাকস্থলী ও যকৃতের শক্তিবর্ধক ও রেচক হিসেবেও কাজ করে।
  • গাছের পাতা সিদ্ধ করে ক্ষতস্থানে লাগিয়ে দিলে ঘা-পাঁচড়া জাতীয় রোগ সেরে যায়।
  • টাইফয়েডের প্রতিষেধক হিসাবে ব্যবহার হয়।
  • অঙ্গপ্রত্যঙ্গের জ্বালাভাব দূর করে।
  • সর্দিকাশি, ব্রঙ্কাইটিস, বাত, অর্শ রোগ নিরাময়ে কার্যকর।
  • ফ্লু ও সাইনাসাইটিসের জন্য উপকারী।

বাসক

বাসকের প্রয়োগঃ
  • বাসক পাতার রস ১-২ চামচ হাফ থেকে এক চামচ মধুসহ খেলে শিশুর সদির্কাশি উপকার পাওয়া যায়।
  • বাসক পাতার রস স্নানের আধ ঘন্টা আগে মাথায় কয়েকদিন মাখলে উকুন মরে যায়। আমবাত ও ব্রণশোথে (ফোঁড়ার প্রাথমিক অবস্থা) বাসক পাতা বেটে প্রলেপ দিলে ফোলা ও ব্যথা কমে যায়।
  • যদি বুকে কফ জমে থাকে এবং তার জন্যে শ্বাসকষ্ট হলে বা কাশি হলে বাসক পাতার রস ১-২ চামচ এবং কন্টিকারীরস ১-২ চামচ, ১ চামচ মধুসহ খেলে কফ সহজে বেরিয়ে আসে।
  • প্রস্রাবে জ্বালা-যন্ত্রনা থাকলে বাসকের ফুল বেটে ২-৩ চামচ মিছরি ১-২ চামচ সরবত করে খেলে এই রোগে উপকার পাওয়া যায়।
  • জ্বর হলে বা অল্প জ্বর থাকলে বাসকের মূল ৫-১০ গ্রাম ধুয়ে থেঁতো করে ১০০ মিলি লিটার জলে ফোটাতে হবে।
  • ২৫ মিলি লিটার থাকতে নামিয়ে তা ছেঁকে নিয়ে দিনে ২ বার করে খেলে জ্বর এবং কাশি দুইই চলে যায়।
  • বাসকের কচিপাতা ১০-১২ টি এক টুকরো হলুদ একসঙ্গে বেটে দাদ বা চুলকানিতে লাগলে কয়েকদিনের মধ্যে তা সেরে যায়।
  • বাসকপাতা বা ফুলের রস ১-২ চামচ মধু বা চিনি ১চামচসহ প্রতিদিন খেলে জন্ডিস রেগে উপকার পাওয়া যায়।
  • পাইরিয়া বা দাঁতের মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়লে বাসক পাতা ২০ টি থেঁতো করে ২ কাপ জলে সিদ্ধ করে ১ কাপ থাকতে নামিয়ে ঈষদুষ্ণ অবস্থায় কুলকুচি করলে এই রোগে উপকার পাওয়া যায়।

বাসকের ভেষজ দাওয়াইঃ
  • শিশুর পেটে কৃমি থাকলে বাসকের ছালের ক্বাথ খাওয়ালে এর উগ্র তিক্ত স্বাদের কারণে কৃমি বের হয়ে যায়।
  • যাদের হাঁপানির টান আছে তারা বাসক পাতা শুকনো করে, ওই পাতা বিড়ি বা চুরুটের মতো পাকিয়ে এর সাহায্যে ধূমপান করলে শ্বাসকষ্ট প্রশমিত হয়।
  • যাদের গায়ে ঘামের গন্ধ হয় তারা বাসক পাতার রস গায়ে লাগালে দুর্গন্ধ দূর হবে।
  • বাসকপাতার রস ও শঙ্খচূর্ণ মিশিয়ে নিয়মিত ব্যবহার করলে রং ফরসা হবে।
  • এক কলসি পানিতে তিন-চারটি বাসকপাতা ফেলে তিন-চার ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখার পর সেই পানি বিশুদ্ধ হয়ে যায়। এরপর ব্যবহার করতে পারেন।
  • পাতার রস নিয়মিত খেলে খিঁচুনি রোগ দূর হয়ে যায়।
  • বাসক পাতার রস মাথায় লাগালের উকুন চলে যায়।
  • বাসক পাতা বা ফুলের রস এক বা দুই চামচ মধু বা চিনি দিয়ে খেলে জন্ডিস ভালো হয়।
  • শরীরে দাদ থাকলে বাসক পাতার রস লাগালে ভালো হয়ে যায়।

ঘৃতকুমারী

অ্যালোভেরা বা ঘৃতকুমারী একটি গুরুত্বপূর্ণ ভেষজ ওষধি গাছ। অ্যালোভেরা গাছের গোড়া থেকেই সবুজ রঙের পাতা হয় এবং পাতাগুলো পুরু ধরনের হয় যার দুই পাশেই করাতের মতো ছোট ছোট কাঁটা থাকে। পাতার ভেতরে স্বচ্ছ পিচ্ছিল ধরনের শাঁস থাকে যাকে অ্যালোভেরা জেল বলা হয়। এই গাছের পাতা থেকেই নতুন গাছ জন্মায়।

ভেষজ গুণ

  • অ্যালোভেরায় রয়েছে অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল এবং অ্যান্টিএইজিং উপাদান যা ত্বকের সুরক্ষায় বিশেষ ভাবে কার্যকর। প্রতি দিন ১ গ্লাস অ্যালোভেরার শরবত পান করলে দেহের ভেতর থেকে ত্বকের নানা সমস্যা যেমন ব্রন, ইনফেকশন এমনকী ত্বকের বুড়িয়ে যাওয়ার সমস্যা থেকে রেহাই পাওয়া যায়। এ ছাড়াও অ্যালোভেরার রস সরাসরি ত্বকে প্রয়োগ করলে ব্রন এবং ব্রনের দাগ থেকেও মুক্তি পাওয়া যায়।
  • ত্বকের পাশাপাশি অ্যালোভেরা চুলের জন্যও বেশ ভালো একটি উপকারী উপাদান। প্রতি দিন মাত্র ১ গ্লাস অ্যালোভেরার শরবত চুলের নানা সমস্যা থেকে রেহাই দেবে। চুল পড়া, চুলের আগা ফাটা এবং চুল পাতলা হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যার সমাধান করে অ্যালোভেরা। এ ছাড়াও অ্যালোভেরার রস সরাসরি তেলের সাথে মিশিয়ে চুলে লাগাতে পারেন।
  • অ্যালোভেরার রস শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে। প্রতি দিন ১ গ্লাস অ্যালোভেরার শরবত দেহের সাদা রক্তকণিকা বাড়ায় যা রোগ প্রতিরোধে বিশেষভাবে কার্যকর।
  • অ্যালোভেরার রস রক্তের সাথে মিশে রক্তে অক্সিজেনের প্রবাহ বাড়িয়ে দেয়। এতে করে আমাদের দেহের শিরা উপশিরায় অক্সিজেন সম্বলিত রক্তের সরবরাহ বেড়ে যায় এবং তা আমাদের হৃদপিণ্ডের কর্মক্ষমতা বাড়ায়।
  • অনেকেই হজমের নানা সমস্যায় ভুগে থাকেন। তাদের জন্য অ্যালোভেরার শরবত মহৌষধ হিসেবে কাজ করে থাকে। অ্যালোভেরার একটি বিশেষ গুণ হল এটি কোষ্ঠকাঠিন্য এবং ডায়েরিয়াজনিত সমস্যার সমাধান করতে পারে। অ্যালোভেরা শুধুমাত্র হজম শক্তিই উন্নত করে না, এর পাশাপাশি পেটের নানা সমস্যার জন্য দায়ী ব্যাকটেরিয়াও ধ্বংস করতে সহায়তা করে।

চালতা

চালতা গ্রামবাংলার একটি অতি পরিচিত ফল হলেও শহরবাসীর কাছ থেকে এটি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। অনেকেরই কাছে এর আচার অনেক পছন্দের। এই ফলের রয়েছে অনেক ভেষজ গুণ। আসুন এক নজরে জেনে নিই উপকারিতা :

  • চালতা হার্ট ও লিভারের টনিক হিসেবে কাজ করে।
  • আয়ুর্বেদ শাস্ত্র মতে চালতার ডায়াবেটিস প্রতিরোধ ক্ষমতাও রয়েছে।
  • চালতা ক্যালসিয়ামের একটি ভালো উৎস। ক্যালসিয়াম হাড় ভালো রাখার জন্য জরুরি। এ ছাড়া ফসফরাস, আয়রন ও ভিটামিন ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’র পাওয়া যায় চালতায়।
  • কোনও ধরনের বদহজমজনিত সমস্যার জন্য চালতা উপকারী।
  • চালতা অন্ত্রের সংক্রমণ, অর্শরোগ, কোষ্ঠকাঠিন্য এবং ডায়েরিয়া নিরাময়ে সাহায্য করে।
  • ভিটামিন ‘এ’ ও ‘সি’ পূর্ণ একটি ফল। তাই এটি স্কার্ভি ও লিভারের সমস্যার জন্য ব্যবহার করা হয়।
  • কিডনি আক্রান্ত রোগীরা নিয়মিত চালতা খেলে উপকার পাবেন।
  • চালতার পাতা ঠান্ডা ও কাশির জন্য উপকারী।

চিরতা

চিরতা বীরুৎ জাতীয় বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ।  জেসিএনেসি বর্গের অন্তর্গত এই গাছটির বৈজ্ঞানিক নাম Swertia chirayita (Roxb. ex Fleming) H. Karst.। এই গাছের উচ্চতা প্রায় দেড় মিটার। গাছে পাতা কম-বেশি ১০ সেমি দীর্ঘ। এর স্বাদ তেঁতো। নানা ধরনের রোগ প্রতিরোধে চিরতা কার্যকর।

ভেষজ গুণ

  • ডায়েরিয়া ও লিভারের বিভিন্ন রোগে প্রতিরোধে চিরতার জল উপকারী।
  • ইনফ্লুয়েঞ্জা হলে ৫ থেকে ১০ গ্রাম চিরতা চার কাপ জলে সিদ্ধ করে দুই কাপ করুন। এর পর ওই জল ছেঁকে সকালে অর্ধেক এবং বিকেলে অর্ধেক করে খেতে দিন। রোগী সুস্থ থাকবে।
  • অ্যালার্জিতে শরীর ফুলে উঠলে চিরতার জল খেলে উপকার পাবেন। রাতে পাঁচ গ্রাম চিরতা ২৫০ মিলিলিটার গরম জলে ভিজিয়ে রেখে পরের দিন সকালে ওই জল দু-তিনবারে খান।
  • গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে বমিভাব হলে এক গ্রাম চিরতা গুঁড়ো করে চিনির জলে মিশিয়ে খেলে বমি বন্ধ হয়ে যাবে। এ ছাড়া ঘন ঘন বা জ্বরের কারণে বারবার বমি হয়ে পেটে কিছুই থাকে না। সে ক্ষেত্রে দুই কাপ গরম জলে পাঁচ গ্রাম চিরতা একটু থেঁতো করে ভিজিয়ে রাখুন। দু-তিন ঘণ্টা পর ছেঁকে জল অল্প অল্প করে খান।
  • হাঁপানির প্রকোপ বেশি হলে আধা গ্রাম চিরতা গুঁড়া তিন ঘণ্টা পর পর মধু মিশিয়ে দুই থেকে তিন বার অল্প অল্প করে চেটে খান, হাঁপানির প্রকোপ কমবে।
  • কৃমির উপদ্রব হলে ২৫০ থেকে ৫০০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত চিরতা অল্প মধু বা একটু চিনি মিশিয়ে খান, সমস্যা মিটবে। এ ছাড়া কৃমির কারণে যদি পেটে ব্যথা হয়, তাও সেরে যাবে।
  • চুলকানিতে ২০ গ্রাম চিরতা অল্প জল দিয়ে ছেঁকে লোহার কড়াইয়ে সরষের তেল গরম করে তাতে ভাজুন, যেন পুড়ে না যায়। এর পর নামিয়ে ছেঁকে অল্প অল্প করে নিয়ে চুলকানিতে ঘষে ঘষে লাগান। তিন দিনের মধ্যে চুলকানি কমে যাবে।
  • চুল পড়ে যাওয়ায় তিন গ্রাম চিরতা এক কাপ গরম জলে ভিজিয়ে রেখে পরের দিন সেই জল ছেঁকে মাথা ধুয়ে ফেলুন। চুল পড়ে যাওয়া কমবে। তবে এক দিন পর পর চার দিন চুল ধুতে হবে। এ ছাড়া ২৫ গ্রাম চিরতা ফুল ২০০ গ্রাম নারিকেল তেলে ভেজে ওই তেল মাথায় ব্যবহার করুন। খুশকি থাকলে সেরে যাবে।

জলপাই

জলপাই শীতকালীন ফল। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই এই ফলটি পাওয়া যায়। আমাদের দেশে সবুজ জলপাই সহজলভ্য। পৃথিবীর অনেক দেশে কালো জলপাই জন্মে। জলপাইয়ের পাতা ও ফল দুটোই ভীষণ উপকারী। জলপাইয়ের রস থেকে যে তেল তৈরি হয় তার রয়েছে যথেষ্ট পুষ্টিগুণ।

প্রচণ্ড পরিমাণে টক এই ফলে রয়েছে — উচ্চ মানের ভিটামিন সি, ভিটামিন এ, ভিটামিন ই। এই ভিটামিনগুলো দেহের রোগজীবাণু ধ্বংস করে, উচ্চরক্তচাপ কমায়, রক্তে চর্বি জমে যাওয়ার প্রবণতা কমিয়ে হৃৎপিণ্ডের রক্তপ্রবাহ ভাল রাখে। ফলে হৃৎপিণ্ড থেকে অধিক পরিশোধিত রক্ত মস্তিষ্কে পৌঁছয়, মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বাড়ে। ত্বকের কাটাছেঁড়া দ্রুত শুকাতে সাহায্য করে। উচ্চ রক্তচাপ ও রক্তে চিনির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে এর রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

সেদ্ধ জলপাইয়ের চেয়ে কাঁচা জলপাইয়ের পুষ্টিমূল্য অধিক। এই ফলের আয়রন রক্তের আরবিসির কর্মশক্তি বৃদ্ধি করে। জলপাইয়ের খোসায় রয়েছে আঁশজাতীয় উপাদান। এই আঁশ কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে, ত্বকের ঔজ্জ্বল্য বাড়ায়, কোলনের পাকস্থলীর ক্যানসার দূর করতে রাখে অগ্রণী ভূমিকা।

জলপাইয়ের পাতারও রয়েছে যথেষ্ট ঔষধি গুণ। এই পাতা ছেঁচে কাটা, ক্ষত হওয়া স্থানে লাগালে কাটা দ্রুত শুকোয়। বাতের ব্যথা, ভাইরাসজনিত জ্বর, ক্রমাগত মোটা হয়ে যাওয়া, জন্ডিস, কাশি, সর্দিজ্বরে জলপাই পাতার গুঁড়ো জরুরি পথ্য হিসেবে কাজ করে। মাথার উকুন তাড়াতে, ত্বকের ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাকজনিত সমস্যা দূর করার জন্য এই পাতার গুঁড়ো ব্যবহৃত হয়। জলপাইয়ের তেল ব্যবহারের প্রচলনও কারও অজানা নয়। রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসে জলপাই পাতার গুঁড়ো ও জলপাইয়ের তেল ব্যবহারে হাড় ও মাংসপেশির ব্যথা কমে।

জলপাইয়ের তেল কুসুম গরম করে চুলের গোড়াতে ম্যাসাজ করলে চুলের পুষ্টি ও বৃদ্ধি ভালো হয়, চুলের ঝরে যাওয়া তুলনামূলক ভাবে কমে।

ডুমুর

  1. হাড় মজবুত করে
  2. হৃদপিণ্ড সুস্থ রাখে
  3. স্তন ক্যানসার প্রতিরোধ করে
  4. উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে
  5. দেহের ওজন কমায়
  6. ডায়াবেটিক নিয়ন্ত্রণ করে
  7. পেটের সমস্যা দূর করে

তুলসী

  1. শ্বাস প্রশ্বাসের সমস্যা
  2. হার্টের অসুখ
  3. মানসিক চাপ
  4. মাথা ব্যথা
  5. বয়স রোধ করা
  6. রোগ নিরাময় ক্ষমতা
  7. পোকার কামড়
  8. ত্বকের সমস্যা

তেঁতুল

তেঁতুল আমাদের দেশের বসন্ত কালের টকজাতীয় ফল হলেও সারা বছর পাওয়া যায়। অনেকেরই ধারণা তেঁতুল খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। বরং তেঁতুলে রয়েছে প্রচুর পুষ্টি ও ভেষজ গুণ।

তেঁতুল দেহে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে এবং হৃদরোগীদের জন্য খুব উপকারী। তেঁতুল দিয়ে কবিরাজি, আয়ুর্বেদীয়, হোমিও ও অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ তৈরি করা হয়। পাকা তেঁতুলে মোট খনিজ পদার্থ সব ফলের চেয়ে অনেক বেশি।

তেঁতুলে খাদ্যশক্তির পরিমাণ নারিকেল ও খেজুর ছাড়া সব ফলের চেয়ে অনেক বেশি। ক্যালসিয়ামের পরিমাণ সব ফলের চেয়ে ৫ থেকে ১০ গুণ বেশি আছে। তেঁতুলে অন্যান্য পুষ্টি উপাদান স্বাভাবিক পরিমাণে আছে।

তেঁতুল যে সব রোগের জন্য উপকারী তা হল স্কার্ভি রোগ, কোষ্ঠবদ্ধতা, শরীর জ্বালা করা। এ সব অসুস্থতায় তেঁতুলের শরবত খুব উপকারী।

তেজপাতা

তেজপাতা সুগন্ধি মশলা। কাঁচা পাতার রঙ সবুজ আর শুকনো পাতার রঙ বাদামি। এটি শুধু মশলা হিসেবেই পরিচিত নয়, এর অনেক ঔষধি গুণও আছে। এপ্রিল থেকে মে মাসে গাছে নতুন পাতার আর্বিভাব হয়। শুধু পাতা নয়, গাছের ছালও গনোরিয়া নামে যৌনরোগ সারাতেও উপকারী।

  • ১. অনেক সময় অনেকের ঘন ঘন তেষ্টা পায়। সে ক্ষেত্রে ১ লিটার জলে তেজপাতা সেদ্ধ করে ছেঁকে নিয়ে ২-৩ বার খান। দেখবেন বার বার তেষ্টা পাচ্ছে না।
  • ২. হালকা গড়নের মানুষের জন্যে তেজপাতা খুব উপকারী। চেহারা ফিরিয়ে আনতে তেজপাতা কুচিয়ে, থেঁতো করে ২ কাপ গরম জলে ১০-১২ ঘণ্টা ভিজিয়ে রেখে এর পর ছেঁকে নিয়ে ২ বার করে ২ সপ্তাহ খেলে শরীরে জোর আসে, লাবণ্য ফিরে আসে।
  • ৩. চর্মরোগ হলে তেজপাতা থেঁতো করে ৪ কাপ জলে সেদ্ধ করে সকাল ও বিকেলে খেতে হবে। ৪-৫ সপ্তাহ খেলেই দাদ-হাজা-চুলকানি সেরে যাবে। এ ছাড়া ওই জল তুলো ভিজিয়ে দাদের জায়গা মুছে নিলেও কাজ হয়।
  • ৪. অনেক সময় প্রস্রাবের রঙ লালচে হয়। সে ক্ষেত্রে তেজপাতা ২-৩ কাপ গরম জলে ২ ঘণ্টা ভিজিয়ে, এর পর ছেঁকে ২-৩ ঘণ্টা অন্তর অন্তর পান করলে প্রস্রাবের রঙ সাদা হয়ে যাবে।
  • ৫. জলে তেজপাতা সেদ্ধ করে সেই জল দিয়ে স্নান করলে ত্বকের অ্যালার্জি সমস্যা কমবে। গায়ের দুর্গন্ধ কাটাতে তেজপাতা চন্দনের মতো বেঁটে মাখলে উপকার হবে।
  • ৬. ফোঁড়া হলে যদি খুব যন্ত্রণা হয়, শক্ত হয়ে যায়, তবে এই অবস্থায় তেজপাতা বেঁটে ২-৩ বার প্রলেপ দিলে যন্ত্রণা কমে যাবে।
  • ৭. যাঁদের অতিরিক্ত ঘাম হয়, তাঁরা প্রতি দিন ১ বার করে তেজপাতা বাঁটা মেখে আধ ঘণ্টা থাকার পর স্নান করে নিলে বেশি ঘাম হওয়া কমে যাবে। এই ভাবে ৭ দিন করতে হবে।
  • ৮. তেজপাতা জলে সেদ্ধ করে ওই জল দিয়ে কুলকুচি করলে মুখের অরুচি কেটে যায়।
  • ৯.সর্দিতে গলা বুজে যায় অনেকেরই। সেই সময় জোরে জোরে কথা বললে বা চিত্‍কার করলে গলা ভেঙে যায়। এই সমস্যা থেকে রেহাই পেতে তেজপাতা থেঁতো করে ৩-৪ বার একটু করে খেলেই হবে।
  • ১০. চোখ ওঠায় ২ তেজ পাতা গরম জলে ধুয়ে নিয়ে তাকে একটু থেঁতো করে ১/৪ কাপ গরণ জলে কয়েক ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখতে হবে। তার পর সেই জল ছেঁকে নিয়ে চোখে দিতে হবে। এই রকম সকালে ২ বার ও বিকালে ২ বার দিলে চোখ লাল হওয়া, করকর করা, পিচুটি পড়া, জুড়ে যাওয়া এগুলি সেরে যাবে।

তেলাকুচা

তেলাকুচা এক প্রকারের ভেষজ উদ্ভিদ। সাধারণ ঝোপে-জঙ্গলে এই ভেষজ উদ্ভিদের দেখা মেলে। এটি লতানো উদ্ভিদ। এটি গাঢ় সবুজ রঙের নরম পাতা ও কাণ্ডবিশিষ্ট একটি লতাজাতীয় বহুবর্ষজীবী। স্থানীয় ভাবে একে ‘কুচিলা’, তেলা, তেলাকচু, তেলাহচি, তেলাচোরা, কেলাকচু, তেলাকুচা বিম্বী ইত্যাদি নামে ডাকা হয়। অনেক অঞ্চলে এটি সবজি হিসেবে খাওয়া হয়। গাছটির ভেষজ ব্যবহারের জন্য এর পাতা, লতা, মূল ও ফল ব্যবহৃত হয়। তেলাকুচায় প্রচুর বিটা-ক্যারোটিন আছে।

ভেষজ গুণ
  • তেলাকুচা ফলে আছে ‘মাস্ট সেল স্টেবিলাইজিং’, ‘এনাফাইলেকটিক-রোধী’ এবং ‘এন্টিহিস্টামিন’ জাতীয় উপাদান। আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় তেলাকুচা বহুল ব্যবহার রয়েছে কুষ্ঠ রোগের ক্ষেত্রে তেলাকুচার বহুল ব্যবহার রয়েছে।
  • সাধারণ জ্বরের ক্ষেত্রে তেলাকুচা ব্যবহার করা যেতে পারে। সর্দিজনিত জ্বরে পাতা ও মূলের রস ২-৩ চামচ একটু গরম করে সকাল-বিকেল খেলে ২-১ দিনেই জ্বরভাব কেটে যায়। ঋতু পরিবর্তনের ফলে, বিশেষ করে শীতের আগে ও পরে যাদের সর্দিজ্বর হয়, তারা যদি আগে থেকেই এ পাতার ও শিকড়ের রস একটু গরম করে সকাল-বিকেল সেবন করে, তবে এই জ্বর আক্রমণের ভয় থাকে না।
  • ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে তেলাকুচা কার্যকর ভূমিকা নেয়। ডায়াবেটিস রোগীরা নিয়মিত তেলাকুচার ঝোল খেলে উপকার পাবেন।
  • এ ছাড়া শোথ (ইডিমা), হাঁপানি, ব্রংকাইটিস ও জন্ডিস রোগের ক্ষেত্রে তেলাকুচার ব্যবহার রয়েছে।
  • পেটে এমন কিছু গেছে যে এখনই বমি করানো দরকার। এ ক্ষেত্রে ৫-৬ চামচ পাতার রস খাইয়ে দিলে বমি হয়ে পেট থেকে অবাঞ্ছিত বস্তু বেরিয়ে আসবে।
  • অত্যন্ত বায়ু বা পিত্তবৃদ্ধি হয়ে যদি মাথা গরম হয়, মাথা ধরে বা রাতে ভালো ঘুম না হয় অথবা অত্যধিক রোদে মাথা ধরে, সে ক্ষেত্রে তেলাকুচা পাতার রস কপালে মাখলে অথবা তেলের সঙ্গে মিশিয়ে মাথায় দিলে ওই সব উপসর্গে শান্তি হয়।
  • রক্ত আমাশয় বা সাদা আমাশয়ে এর পাতার রস চিনি-সহ সেবনে উপকার হয়।

 

থানকুনি পাতা

  1. উপকারিতা
    1. জ্বর
    2. পেটের পীড়া
    3. পাঁচড়া রোধ
    4. গ্যাস্ট্রিক
    5. হজমশক্তি বৃদ্ধি
    6. রক্ত দূষণ রোধে থানকুনি
    7. বাক স্ফুরণে
    8. খুসখুসে কাশি
    9. আমাশয়
    10. পেট ব্যথা
    11. লিভারের সমস্যা

নিম

  1. নিমের কিছু ব্যবহারিক উপকারিতা
    1. কফজনিত বুকের ব্যথা
    2. কৃমি
    3. উকুন নাশ
    4. অজীর্ণ
    5. খোস পাঁচড়া
    6. পোকামাকড়ের কামড়
    7. দাঁতের রোগ
    8. জন্ডিস
    9. ডায়াবেটিস রোগ

পুদিনা পাতা

  1. ভেষজ গুণ
    1. হাঁপানি
    2. পেটের ব্যাথায়
    3. ক্যানসার প্রতিরোধক

পেঁপে

পেঁপে কাঁচা অবস্থায় সুস্বাদু না হলেও নিরামিষ হিসাবে কাঁচা পেঁপের ব্যবহার খুবই প্রচলিত।

আর পেঁপের পুষ্টিগুণ বিবেচনায় এটি একটি মূল্যবান ফল। এর বৈজ্ঞানিক নাম ক্যারিকা পাপায়া। পেঁপের আরেক নাম পাওয়ার ফ্রুট। কারণ, এতে রয়েছে অনেক রোগের নিরাময় ক্ষমতা। এর পেপেইন নামের উপাদান আমিষকে হজম করে সহজেই এবং পরিপাক তন্ত্রকে পরিষ্কার করে। ওজন কমাতেও বেশ সহায়ক।

অন্য দিকে আপেলের চেয়ে পেঁপেতে তেরো গুণ বেশি ভিটামিন ‘সি’ এবং দ্বিগুণ পরিমাণ বেশি পটাশিয়াম বিদ্যমান। আপেল ও কমলার চেয়ে পেঁপেতে ভিটামিন ‘ই’-এর পরিমাণও চার গুণ বেশি। ১০০ গ্রাম পেঁপেতে ক্যালসিয়াম ১৭ মিগ্রা, ফসফরাস ১৩ মিগ্রা, আয়রন ০.৫ মিগ্রা,ভিটামিন সি ৫৭ মিগ্রা এবং সামান্য ভিটামিন ‘বি’ কমপ্লেক্সও রয়েছে। স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এ সব উপাদান গুরুত্বপূর্ণ।

গবেষকদের মতে, লাইকোপিন ক্যানসার প্রতিরোধী। পুষ্টি বিবেচনায় পেঁপে অনেক ফলের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। কমলার চেয়ে পেঁপেতে ৩৩ শতাংশ বেশি ভিটামিন সি এবং ৫০ শতাংশ বেশি পটাশিয়াম রয়েছে। ওজন কমাতে পেঁপে বেশ সহায়ক। অন্যান্য ফলের তুলনায় পেঁপেতে ক্যারোটিন অনেক বেশি থাকে। কিন্তু ক্যালোরির পরিমাণ অনেক কম থাকায় যাঁরা মেদ সমস্যায় ভুগছেন তাঁরা অনায়াসে খেতে পারেন এ ফলটি। এ ছাড়াও এই ফলে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ ও সি আছে যা শরীরের জন্য অনেক বেশি দরকারী। পেঁপেকে বলা হয় পুষ্টি উপাদানের ‘রাজভাণ্ডার’। হজমকারী হিসাবে পেঁপে খুবই জনপ্রিয়।

পাকা পেঁপে কোষ্ঠকাঠিন্য সারাতে সাহায্য করে। প্রচুর আঁশ ও ক্যারোটিন থাকায় এটি অন্ত্রের ক্যানসারের ঝুঁকিও কমায়। পেঁপে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায়। প্রতি দিন দু’ কাপ পেঁপে খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ভালো।

এটি ব্লাড প্রেসার ঠিক রাখার পাশাপাশি রক্তের প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করে। এমনকী শরীরের ভেতরের ক্ষতিকর সোডিয়ামের পরিমাণকেও কমিয়ে দেয়। ফলে হৃদরোগের সমস্যা থেকে সহজেই মুক্তি পাওয়া যায়। এ কারণেই হৃদরোগীদের সব সময় পেঁপে খেতে বলা হয়।

পেঁয়াজ

পেঁয়াজে কুইয়ারসেটিন, কেমফেরল এবং সালফারের বিভিন্ন উপাদান রয়েছে। যা ম্যালেরিয়া, বাত, ব্যাকটেরিয়া ও উচ্চ রক্তচাপরোধী হিসেবে কাজ করে। গবেষণায় প্রমাণিত পেঁয়াজ দেহে সুগার ও কোলেস্টেরলের পরিমাণ হ্রাস করতে দারুণ কার্যকর। এর নিয়মিত ব্যবহারে ইনসুলিন ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা হ্রাস পায়। তা ছাড়া পেঁয়াজ মাথা ও কান ব্যথা, পেটে গ্যাস জমা হাওয়া, পোকামাকড়ের দংশনের ক্ষতি থেকে দেহকে রক্ষা করে এবং কামোত্তেজক হিসেবেও কাজ করে। পেঁয়াজ শরীরের স্বাভাবিক ক্যানসার প্রতিরোধী ক্ষমতাকে উত্তেজিত করে প্রাকৃতিক ক্যানসার প্রতিরোধ প্রক্রিয়াকে জোরদার করে।

সাধারণ এই গুণাগুণ ছাড়া রয়েছে পেঁয়াজের ব্যতিক্রমী কিছু ব্যবহার।

  • ১। মশার উৎপাত বা কীটপতঙ্গের উপদ্রব থেকে রক্ষা পেতে পেঁয়াজের রস শরীরের অনাবৃত অংশে লাগিয়ে নিন, দেখবেন মশা বা কীটপতঙ্গ কামড়াতে আসছে না।
  • ২। কীটপতঙ্গের কামড়ের ব্যথা দূর করতেও পেঁয়াজ উপকারী। পোকামাকড়ের কামড়ের ব্যথা দূর করতে এক টুকরো পেঁয়াজ ঘষে দিন ব্যথার স্থানে। ব্যথা কমে যাবে।
  • ৩। গলা ব্যথা হলে একটু গরম জলে পেঁয়াজের রস দিয়ে অল্প অল্প করে খান। আরাম লাগবে। গলা ব্যথা সেরে যাবে।
  • ৪। পুড়ে যাওয়া ব্যথা দূর করতে পেঁয়াজ সমান উপকারী। শরীর যে অংশটি পুড়ে গিয়েছে সেখানে পেঁয়াজের রস লাগিয়ে রাখুন। দেখবেন পোড়া স্থানের ব্যথা থাকবে না, জ্বালাও কমবে।
  • ৫। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলেন গালে একটা ব্রণ। ভয় পাবেন না বা চিন্তা করবেন না। ব্রণে পেঁয়াজের রস লাগিয়ে দিন এবং কিছু দিনের মধ্যেই ব্রণ চলে যাবে।
  • ৭। চুল পড়া কমাতে চুলে পেঁয়াজের রস মাখার বিকল্প কিছু হতে পারে না। চুলের গোড়াকে শক্ত করে পেঁয়াজের রস। তাই চুল পড়া কমে যায় দ্রুত।
  • ৮। অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল হিসেবেও কাজ করে এই পেঁয়াজ। এতে রয়েছে অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল উপাদান। তাই ফোঁড়া বা ঘা পেঁয়াজ দিয়ে ধুলে তাড়াতাড়ি সেরে যায়।
  • ৯। হেঁচকি ওঠা বন্ধ করতেও পেঁয়াজের রস ভীষণ উপকারী। এক টুকরো পেঁয়াজ কেটে, তার রস মিশিয়ে জলে মিশিয়ে খান। হেঁচকি বন্ধ হয়ে যাবে।
  • ১০। বমি বন্ধ করতে হলে কয়েক ফোঁটা পেঁয়াজের রস জলে মিশিয়ে খান। কিছুক্ষণের মধ্যেই বমি বন্ধ হয়ে যাবে।

আদা, রসুন ও পেঁয়াজ আলাদা আলাদা ব্যবহার করলে উপরোক্ত উপকারিতা পাওয়া যাবে। তা ছাড়া এগুলোর সম্মিলিত ব্যবহারে কার্যকারিতা আরেও বেড়ে যাবে। তাই এই ত্রিমূলকে আপনার নিয়মিত খাদ্য তালিকার অংশ হিসেবে রাখুন। যাদের কাঁচা ত্রিমূল সেবনে বিশেষ অসুবিধা হয় তাঁরা বিশেষজ্ঞের পরামর্শে গার্লিক ট্যাবলেট সেবন করতে পারেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, ত্রিমূলা অর্থাৎ আদা, রসুন, পেঁয়াজ শুধু মসলাই নয়, এগুলো যেন জীবনেরই ত্রিমূল।

বহেড়া

বহেড়ার বৈজ্ঞানিক নাম ‘টারমিনালিয়া বেলেরিকা’। আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে একে বিভিতকী বলা হয়। সাধারণ ভাবে এর পরিচিতি বহেড়া নামেই। এই গাছের জন্ম ভারতবর্ষে। পশ্চিমবঙ্গে বনাঞ্চল ও গ্রামে এই গাছের দেখা মেলে। বহেড়া গাছ ১৫-২৫ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়। এর বাকল ধূসর ছাই রঙের। পাতা কাঁঠাল পাতার মতো মোটা, লম্বায় প্রায় ৫ ইঞ্চি। এর ফুল ডিম্বাকৃতির প্রায় ১ ইঞ্চির মতো লম্বা। কাঁচা পাকা বহেড়া ফলের রঙ সবুজ থাকে। পেকে গেলে লাল। পরে শুকিয়ে গেলে ক্রমশ বাদামি। ফলের বাইরের আবরণ মসৃণ ও শক্ত এবং ভেতরে একটি মাত্র শক্ত বীজ থাকে। ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাসের ভেতর এর ফল পেকে যায়।

ভেষজ গুণ
  • শ্বেতী রোগ সারাতে বহেড়া যথেষ্ট উপকারী। বহেড়ার বিচির শাঁসের তেল বের করে নিয়মিত শ্বেতীর উপর লাগালে অল্প দিনেই গায়ের রঙ স্বাভাবিক হবে।
  • রক্ত আমাশয় হলে প্রতি দিন জলের সঙ্গে বহেড়া ফলের চূর্ণ মিশিয়ে পান করলে আমাশয় ভালো হয়ে যাবে।
  • অকালে চুল পাকা রোধে বহেড়া উপকারী। বহেড়া ফলের বিচি বাদ দিয়ে শুধু খোসা নিয়ে জল দিয়ে ভালো ভাবে মসৃণ করে বাঁটুন। এ বার বাঁটা মিশ্রণটি এক কাপ জলে গুলে সেটা ছেঁকে নিন। এ বার সেই জল দিয়ে চুল ধুয়ে ফেলুন। এ ভাবে নিয়মিত বহেড়ার জল দিয়ে চুল ধুলে উপকার পাওয়া যাবে।
  • আধ চা চামচ বহেড়া চূর্ণ ও ঘি একসাথে গরম করে তার সাথে মধু মিশিয়ে চেটে খেলে কফের সমস্যা কমে যায়।
  • যাদের মাথায় অকালে টাক পড়েছে তারা বহেড়ার বিচির শাঁস অল্প জল মিহি করে বেঁটে টাকে লাগালে উপকার পাওয়া যায়।
  • শরীরে কোনও স্থানে ফুলে গেলে বহেড়ার ছাল বেঁটে একটু গরম করে নিয়ে ফুলো জায়গায় প্রলেপ দিলে ফুলো কমে যাবে।

    রসুন

    রসুনে রয়েছে এলিসিন যা ব্রডস্পেকট্রাম যা অ্যান্টিবায়োটিক হিসেবে কাজ করে। তা ছাড়া এলিসটাটিন, এলিসাটিনসহ নানা প্রকার কার্যকর উপাদান রয়েছে। যা রক্তের কোলেস্টেরল হ্রাস সহ বিভিন্ন কাজ করে থাকে। প্রথম বার হার্ট অ্যাটাকের পর রোজ কাঁচা রসুন খাওয়া রোগীরা বেশির ভাগই দ্বিতীয় অ্যাটাকে আক্রান্ত হন না বা হলেও অনেক পরে। নিয়মিত কাঁচা রসুন সেবনে মোট কোলেস্টেরলের মাত্রা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে। কাঁচা রসুন শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, বিভিন্ন সংক্রমণ রোধ করে, ক্ষত দূরীকরণে সাহায্য করে, সর্দিকাশি ও প্রদাহ দূর করে। যে কোনও রসুনের একটা কোয়া পাতলা পর্দা বাদ দিয়ে ছেঁচ করে বা চিবিয়ে ভরা পেটে খেতে শুরু করুন। আস্তে আস্তে এর মাত্রা বাড়ানো যায়। তবে যাঁরা করোনারি হৃদরোগী, বিশেষ করে যাঁরা নিয়মিত অ্যাসপিরিন খান, তাঁরা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে রসুন খেতে শুরু করুন।

    এক গবেষণায় দেখা গেছে, একটি মাঝারি সাইজের রসুনে এক লাখ ইউনিট পেনিসিলিনের সমান অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যক্ষমতা রয়েছে। শুধু তাই নয়, ব্যাকটেরিয়া ও প্রোটোজোয়ার মাধ্যমে সৃষ্টি অ্যামিবিক ডিসেনট্রি নির্মূলের ক্ষেত্রে রসুন বেশ কার্যকরী। আধুনিক ভেষজ চিকিত্সকরাও সর্দি, কাশি, জ্বর, ফ্লু, ব্রঙ্কাইটিস, কৃমি, রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ, খাদ্য পরিপাকের সমস্যাসহ লিভার ও পিত্তথলির নানা উপসর্গ দূর করতে রসুন খাওয়ার পরামর্শ দেন। দেহের রোগ সংক্রমণ দূর করার জন্য এক সঙ্গে তিন কোয়া রসুন দিনে তিন থেকে চার বার চিবিয়ে খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। রক্তের চাপ ও রক্তের কোলেস্টেরলের মাত্রা কমানোর জন্য প্রতি দিন তিন থেকে ১০ কোয়া রসুন খেতে পারেন। তা ছাড়া রসুনের জল সেবন করতে হলে ছয় কোয়া রসুন পিষে এককাপ ঠান্ডা জলে ৬ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখুন। তার পর ভালো ভাবে ছেঁকে রসুন জল সেবন করুন।

    এক নজরে রসুনের উপকারিতা —

    • যাঁরা উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন তাঁরা রসুন খেতে পারেন। উপকার পাবেন।
    • রক্তে কোলেস্টেরল স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হলে কাঁচা রসুন চিবিয়ে খান।
    • আয়ুর্বেদিক ওষুধ বানাতে রসুন ব্যবহৃত হয়। ওজন কমানোর আয়ুর্বেদিক প্যাকেট বানাতেও ব্যবহৃত হয় রসুন।
    • সর্দিকাশিতেও রসুন উপকারী।
    • শরীরের ব্যথা কমায় রসুন। রসুন হচ্ছে ন্যাচারাল পেনকিলার। শিশু কিংবা বড়দের দাঁতে ব্যথা হলে একে কোয়া রসুন চিবোলে দাঁতে ব্যথা উপশম হবে।
    • ক্যানসার প্রতিরোধ করে রসুন।
    • রসুনে রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণে ম্যাঙ্গানিজ, ভিটামিন বি ৬ এবং ভিটামিন সি।
    • হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক রসুন।
    • নিয়মিত রসুন খেলে ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসজনিত রোগের ঝুঁকি কমে যায়।
    • আমেরিকান ক্যানসার ইনস্টিটিউটের গবেষকরা জানান, নিয়মিত রসুন খেলে প্রোস্টেট ক্যানসার, স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়।
    • সবচেয়ে বেশি উপকার পেতে কাঁচা রসুন চিবিয়ে খান। কাঁচা রসুন অ্যান্টিবায়োটিকের মতো কাজ করে।

সজনে

সজনে ডাঁটা, পাতা ও ফুল, তিনেরই উপকারিতা আছে।

সজনে ডাঁটা একটি মরসুমি ফল। আয়ুর্বেদে দু’ ধরনের সজনের উল্লেখ আছে — লাল ও সবুজ সজনে। লাল সজনে এখন আর চোখে পড়ে না। সবুজ সজনে পাওয়া যায়। এখন বাণিজ্যিক ভাবে কেউ সজনে লাগায় না। চৈত্র মাসে মাত্র কিছু দিনের জন্য সজনে পাওয়া যায়। কারণ পরিকল্পিত ভাবে এ গাছ কেউ চাষ করে না। ডাল মাটিতে পুঁতে দিলে গাছ হয়। অথচ সজনের অনেক গুণ। সজনের পাতা, ফুল ও ছাল সবই উপকারী।

আয়ুর্বেদ মতে সজনে ক্ষুধা বাড়ায়, বলবীর্য বৃদ্ধি করে। এতে রয়েছে ক্ষার ও লবণ। সজনে পেটের অসুখে উপকারী এবং বাত ও শ্লেষ্মা সারে। গোদ ও গলগণ্ড হলে সজনে খেতে বলা হয়। সজনে চোখের জন্যও ভালো। পেটে গ্যাস উৎপন্নে বাধা দেয়। সজনে সব ধরনের ব্যথা, কাশি, নাক-মুখ থেকে রক্ত পড়া বা রক্তপিত্ত সারায় ও শরীরের অনাকাঙ্ক্ষিত দাগ দূর করে।

শরীরের কোনও জায়গা ফুলে গেলে বা কারও বাত হলে সজনে বেসনের সাথে খড়খড়ে করে রান্না করে খেলে উপকার হবে। সজনে পাতা সামান্য জল দিয়ে বেঁটে রস বের করে সকাল-বিকেল দু’ চামচ করে খাবেন। উচ্চ রক্তচাপ কমবে। সজনে পাতা বেঁটে টিউমারে লাগালে বসে যাবে। কুষ্ঠরোগের প্রাথমিক অবস্থায় সজনে বীজের তেল বেশ কিছু দিন লাগালে সেরে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সজনের মূলের ছাল পিষে দাদ পরিষ্কার করে প্রলেপ দিলে দাদ ভালো হয়। সজনে পাতার ঝোল খেলে সর্দিজ্বর ভালো হয়। সজনে পাতা শাকের মতো রান্না করে বা ঝোল রান্না করে খেলে হজমশক্তি বৃদ্ধি পায় এবং মুখে রুচি আসে।

সজনে ফুল শাকের মতো রান্না করে খেলে জলবসন্ত হয় না। এ ছাড়া সজনেও বসন্ত প্রতিষেধক। চোখে যদি পিচুটি পড়ে, ব্যথা হয় বা চোখ দিয়ে জল পড়ে তা হলে সজনে পাতা সেদ্ধ জল দিয়ে চোখ ধুয়ে ফেললে সমস্যা চলে যায়।

শিম

শীতকালীন সবজি হিসেবে শিমের কদর বেশি। শুধু রসনাবিলাসই নয়, অন্যান্য খাদ্যগুণও এতে রয়েছে। শিমে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন, ফাইবার, ভিটামিন ও মিনারেল থাকে।

যাঁরা সরাসরি প্রোটিন খান না অর্থাৎ মাছ, মাংস খাওয়া হয় না, তাঁদের জন্য শিমের বিচি শরীরে প্রয়োজনীয় প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে পারে। যাঁদের আমিষ খাওয়ায় সীমাবদ্ধতা আছে, তাঁরা অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে খাবেন। আর এই শীতে নিয়মিত শিম খেলে ত্বকও ভালো থাকবে।

উপকারিতা

  • ১. শিম পরিপাকের জন্য খুব ভালো। এ ছাড়া দেহ ঠান্ডা রাখতেও শিম খাওয়া যায়।
  • ২. শিমে ক্যালোরির পরিমাণ বেশ কম থাকে। তাই যাঁরা সরাসরি প্রোটিন খান না, তাঁরা শিম খেতে পারেন।
  • ৩. বড় আকারের শিম রুচিকর। এ ছাড়া বাতের ব্যাথা, ক্ষুধা ও মুখের স্বাদ বাড়িয়ে তোলে এই সবজিটি।
  • ৪. কোনও কিছু কামড়ালে শিমপাতার রস দিনে দু’ বার করে তিন দিন করে লাগালে আরাম পাওয়া যায়।
  • ৫. শিমের বিভিন্ন ধরণের পুষ্টিগুণ ও শিমের মধ্যে থাকা খনিজ চুল পড়া রোধে কাজ করে। এ ছাড়া চুলের স্বাস্থ্য সুরক্ষায়ও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে এই সবজির খাদ্যগুণ।
  • ৬. শীতে ত্বক শুষ্ক হয়ে যায়। পরিচর্চার অভাবে চামড়ার উপরিভাগ ফেটেও যায়। আর এ জন্য নিয়মিত শিম ত্বকে মাখলে উজ্জ্বল ও নরম থাকে ত্বক। সেই সাথে চর্মরোগও উধাও হয়ে যায়।
  • ৭. শিমের পুষ্টিগুণ শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়।
  • ৮. শিম কোলন ক্যান্সার প্রতিরোধে বেশ কার্যকর। এ ছাড়া কোষ্ঠকাঠিন্য আক্রান্ত রোগীদের জন্যও উপকারী এই সবজি।
  • ৯. সাদা শিম বাতের ব্যাথা ও কফ বিনাশ করে। হলদেটে শিম সবচেয়ে উপকারী।
  • ১০. চুন ও শিম পাতার রসের প্রলেপ ২-৩ বার করে ৪-৫ দিন লাগালে কানের লতির বা কর্ণমূলের ফোলা কমে যায়। গলায় ব্যথা হলেও ঘরোয়া এই ওষুধ ব্যবহার করতে পারেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *